ঢাকাশনিবার , ২৭শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
  1. অপরাধ
  2. অর্থনীতি
  3. অস্ট্রেলিয়া
  4. আইন আদালত
  5. আন্তর্জাতিক
  6. ইসলাম
  7. কৃষি
  8. খেলাধুলা
  9. জাতীয়
  10. তথ্যপ্রযুক্তি
  11. নেদারল্যান্ডস
  12. পর্যটন
  13. বিনোদন
  14. মতামত
  15. মেক্সিকো
আজকের সর্বশেষ সবখবর

বাজেট ২০২৬-২৭ : কতটা বৈষম্য দূর করবে?

আজকের কলাপাড়া অনলাইন ডেস্ক
জুন ২৭, ২০২৬ ১০:২১ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

 

বাজেট হলো সমাজের অগ্রাধিকারের আয়না। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাংলাদেশের প্রস্তাবিত বাজেটে সেই আয়নায় কী দেখা যাচ্ছে? একটি দেশ যেখানে গিনি সহগ ০.৪৯৯-এ পৌঁছেছে, যেখানে সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ মানুষের কাছে মোট আয়ের অসামঞ্জস্যপূর্ণ অংশ জমা হয়েছে, সেখানে এই বাজেট অসমতার মূলে কুঠারাঘাত করছে কি, নাকি শুধু প্রলেপ দিচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি।

 

অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্টিগলিৎজ  বলেছেন, বাজার নিজে থেকে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে না। রাষ্ট্রকে সক্রিয়ভাবে হস্তক্ষেপ করতে হয়। এই বাজেটে সামাজিক সুরক্ষায় ১,৪৪,৩৩৮ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে, যা মোট বাজেটের প্রায় ১৫.৩৯ শতাংশ এবং জিডিপির ২.১ শতাংশ। সংখ্যাটি বড়। কিন্তু সংখ্যার পেছনের গল্পটি আরও গুরুত্বপূর্ণ।

ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচিতে ৪১ লাখ পরিবারের প্রধান নারীকে মাসে ২,৫০০ টাকা দেওয়া হবে। মোট বরাদ্দ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে ১৪,৫০০ কোটি টাকা। কৃষক কার্ডে ৪২.৫ লাখ কৃষককে বছরে ২,৫০০ টাকা দেওয়া হবে, বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১,০৬২ কোটি টাকা। এই কর্মসূচিগুলো নীতিগতভাবে সঠিক। প্রশ্ন হলো, মাসে ২,৫০০ টাকা কি সত্যিকারের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ঘটাতে পারে, যেখানে এক কেজি চালের দাম ৬০-৭০ টাকা?

প্রশ্ন হলো, এই নগদ হস্তান্তর কি সত্যিই কল্যাণ বাড়াবে? বৈশ্বিক প্রমাণ মূলত ইতিবাচক। বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ-ভিত্তিক গবেষণায় দেখা গেছে যে নারীর হাতে নগদ হস্তান্তর পরিবারের পুষ্টি, শিশু শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। মেক্সিকোর ‘ওপর্তুনিদাদেস’, ব্রাজিলের ‘বোলসা ফামিলিয়া’ এবং ভারতের ‘জনধন কর্মসূচি’র অভিজ্ঞতা এই ধারণাটিকে আরও শক্তিশালী ভিত্তি প্রদান করে।

 

তবে বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ বিশাল। প্রথমত, সুবিধাভোগী নির্বাচন প্রক্রিয়া: কারা পাবেন, কারা পাবেন না এই তালিকা তৈরি করতে স্থানীয় সরকারের সক্ষমতা ও স্বচ্ছতা অপরিহার্য। বাংলাদেশে ঐতিহাসিকভাবে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে ‘লিকেজ’ বা তালিকা থেকে প্রকৃত দরিদ্রদের বাদ দিয়ে রাজনৈতিকভাবে সংযুক্তদের অন্তর্ভুক্ত করার সমস্যা রয়েছে।

দ্বিতীয়ত, ডিজিটাল পেমেন্ট অবকাঠামো: সরকার ব্যাংক ও মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে অর্থ পাঠাতে চাইছে, কিন্তু প্রত্যন্ত অঞ্চলে ইন্টারনেট সংযোগ ও এজেন্ট ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক এখনো পর্যাপ্ত নয়।

বাংলাদেশে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের বড় অংশ ঐতিহাসিকভাবে অবকাঠামোতে যায়, সেবার মানে যায় কম। নতুন বরাদ্দের সঙ্গে জবাবদিহিতার কাঠামো না বদলালে ফলাফল আগের মতোই থাকবে।

আরও গভীর সমস্যা হলো লক্ষ্য নির্বাচন ও বাস্তবায়নের প্রশ্ন। বাংলাদেশের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলোতে ঐতিহাসিকভাবে টার্গেটিং ত্রুটি ও লিকেজ বিশাল সমস্যা। নতুন ডেটাবেস তৈরির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, কিন্তু রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার চাপে সুবিধাভোগী নির্বাচনে পক্ষপাত ঠেকানো কতটা সম্ভব হবে, সেটি একটি বড় প্রশ্ন। ৯০টি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির মধ্যে মাত্র ৪৮টি ‘প্রো-পুওর’ বলে চিহ্নিত এবং সেগুলোতে মোট বরাদ্দের ৩৮ শতাংশেরও কম যাচ্ছে।

‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচির মাধ্যমে ৪২.৫ লাখ কৃষককে প্রতি বছর ২ হাজার ৫০০ টাকা নগদ সহায়তা প্রদানের পরিকল্পনা রয়েছে, এর জন্য বরাদ্দ ১ হাজার ৬২ কোটি ৫০ লাখ টাকা। সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকার কৃষি ঋণের সুদ মওকুফও এরই মধ্যে কার্যকর হয়েছে।

শুধু নগদ হস্তান্তর নয়, বরং সম্পদ প্রদান (পশু, যন্ত্রপাতি), প্রশিক্ষণ ও মনস্তাত্ত্বিক সহায়তার সমন্বয়ে অতি-দরিদ্রদের জীবনে দীর্ঘস্থায়ী ইতিবাচক পরিবর্তন আসে। এ দৃষ্টিকোণ থেকে কৃষক কার্ডের নগদ সহায়তা সীমিত প্রভাব রাখবে যদি না কৃষি বিপণন ব্যবস্থা, কোল্ড চেইন অবকাঠামো এবং কৃষি সম্প্রসারণ সেবার উন্নয়নের সঙ্গে কৃষি কার্ড যুক্ত হয়।

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের সংকট এই বাজেটের সবচেয়ে বড় প্রেক্ষাপট। ডিসেম্বর ২০২৫-এ খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছিল ৩৫.৭৩ শতাংশে, অর্থাৎ প্রায় ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা। মূলধন পর্যাপ্ততা অনুপাত ঋণাত্মক, অর্থাৎ -২.৬৪ শতাংশে।

পাঁচটি ব্যাংকে খেলাপি ঋণের হার ৯০ শতাংশেরও বেশি। এই ব্যাংকগুলো কার্যত দেউলিয়া। জোসেফ স্টিগলিৎজ এই পরিস্থিতিকে বলতেন ‘বাজার ব্যর্থতার চরম উদাহরণ’, যেখানে ঋণ অনুমোদনে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ব্যাংকিং ব্যবস্থার মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছে।

বাজেটে দুর্বল ব্যাংকগুলোর পুনর্মূলধনীকরণে ৪০,০০০ কোটি টাকা ব্যয় করা হচ্ছে। এই অর্থ আসছে করদাতাদের পকেট থেকে। অথচ যারা ব্যাংকিং ব্যবস্থা ধ্বংস করেছে, তাদের জবাবদিহিতার ব্যবস্থা বাজেট বক্তৃতায় স্পষ্ট নয়।

জোসেফ স্টিগলিৎজ এই ধরনের বেলআউটের সমালোচক ছিলেন। তিনি বলতেন, ব্যাংক বেলআউট তখনই ন্যায়সঙ্গত যখন দুর্নীতিবাজ পরিচালকদের শাস্তি এবং নতুন নিয়ন্ত্রণ কাঠামো একসাথে আসে।

বাজেটে ব্যাংক পরিচালনায় রাজনৈতিক নিয়োগ ও হস্তক্ষেপ বন্ধ করার ঘোষণা এসেছে। আইনে সংশোধন করা হয়েছে বলে উল্লেখ রয়েছে। ঝুঁকিভিত্তিক পদক্ষেপ চালু করার কথা বলা হয়েছে। বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার উদ্যোগের কথাও আছে। এগুলো সঠিক দিকে পদক্ষেপ। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সত্যিকারের স্বায়ত্তশাসন ও কর্পোরেট গভর্ন্যান্স নিশ্চিত না হলে পুনরাবৃত্তি ঠেকানো কঠিন।

সরকারি ঋণ ও সুদ পরিশোধের চাপ প্রতিদিন বাড়ছে। ২০০৫-০৬ সালে সুদ ব্যয় ছিল ৮,৫০০ কোটি টাকা, যা ২০২৩-২৪ সালে বেড়ে ১,১৪,৭০০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। ২০২৬-২৭-এ ব্যাংকিং খাত থেকে ১,১২,০০০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা আছে। এই ঋণ বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ সংকুচিত করে। যখন সরকার ব্যাংক থেকে এত বেশি নেয়, তখন শিল্পোদ্যোক্তারা সঠিক সুদে ঋণ পান না। ক্রাউডিং আউটের এই ফাঁদ বাংলাদেশের বেসরকারি বিনিয়োগকে দশকের সর্বনিম্নে (জিডিপির ২২.৪৮ শতাংশ) নামিয়ে এনেছে।

স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ৩৫,৪৭৭ কোটি থেকে বাড়িয়ে ৬৯,৪০৯ কোটি টাকায় নেওয়া প্রস্তাব করা হয়েছে, প্রায় দ্বিগুণ। শিক্ষায় বরাদ্দ বেড়েছে ৮৭,২০৬ কোটি থেকে ১,৩৬,৬০৬ কোটিতে। এই বৃদ্ধি প্রশংসনীয়। কিন্তু জোসেফ স্টিগলিৎজ সতর্ক করতেন, বরাদ্দ বাড়ানো মানেই মান বাড়ানো নয়। বাংলাদেশে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের বড় অংশ ঐতিহাসিকভাবে অবকাঠামোতে যায়, সেবার মানে যায় কম। নতুন বরাদ্দের সঙ্গে জবাবদিহিতার কাঠামো না বদলালে ফলাফল আগের মতোই থাকবে।

ডায়ালাইসিস ফিল্টার আমদানিতে শুল্ক ও ভ্যাট মওকুফের সিদ্ধান্তে প্রতিটি ডায়ালাইসিসে ৮০০ টাকা সাশ্রয় হবে। হার্টের রিং ও স্টেন্টে ভ্যাট মওকুফে প্রতিটির দাম ২০,০০০ টাকা কমবে। চোখের ইন্ট্রাওকুলার লেন্সে ছাড়ে ৫,০০০ টাকা সাশ্রয়। এগুলো ছোট কিন্তু সত্যিকারের মানবিক পদক্ষেপ। এখানে স্টিগলিৎজের দর্শন স্পষ্ট।

তবে বৈষম্য কমানোর সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার হলো কার্যকর প্রগতিশীল করব্যবস্থা। এই বাজেটে ব্যক্তি করমুক্ত সীমা ৩,৫০,০০০ থেকে বাড়িয়ে ৩,৭৫,০০০ টাকা করা হয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে ধাপে ধাপে ৪,৫০,০০০ পর্যন্ত নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

উচ্চ আয়ের ক্ষেত্রে ৩ কোটি টাকার বেশিতে ৩৫ শতাংশ কর প্রস্তাব করা হয়েছে। এটি সঠিক দিকে যাত্রা। কিন্তু করের হার বাড়ানোর চেয়ে বড় সমস্যা হলো কর ফাঁকি। মাত্র ৩০-৩৫ শতাংশ টিআইএনের ধারক কর দেন। এই বাজেটে কর ব্যবস্থার সম্পূর্ণ অটোমেশনের কথা বলা হয়েছে, কেন্দ্রীয় ডেটা ইন্টিগ্রেশনের কথা বলা হয়েছে। ব্যাংক হিসাব খোলার সময় টিআইএন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব এসেছে। এগুলো কর ভিত্তি সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখবে।

যে সমাজে মানুষের মধ্যে আয়ের ব্যবধান বাড়তে থাকে, সেই সমাজের সামগ্রিক চাহিদা দুর্বল হয়, বিনিয়োগ কমে এবং প্রবৃদ্ধি মন্থর হয়। এই বাজেটে সামাজিক সুরক্ষার বিস্তার এই দিক থেকেও ইতিবাচক।

জোসেফ স্টিগলিৎজ বলতেন, বৈষম্য কমানো নৈতিক প্রশ্ন নয় শুধু, এটি অর্থনৈতিক প্রশ্নও। যে সমাজে মানুষের মধ্যে আয়ের ব্যবধান বাড়তে থাকে, সেই সমাজের সামগ্রিক চাহিদা দুর্বল হয়, বিনিয়োগ কমে এবং প্রবৃদ্ধি মন্থর হয়। এই বাজেটে সামাজিক সুরক্ষার বিস্তার এই দিক থেকেও ইতিবাচক। কিন্তু যদি বড় বিনিয়োগকারী ও শিল্পপতিরা করের ন্যায্য ভাগ না দেন, তাহলে সামাজিক সুরক্ষার অর্থায়নের ভার পড়ে মধ্যবিত্ত ও গরিবের ওপর।

প্রস্তাবিত বাজেটে যে বিষয়গুলো বিশেষভাবে মনোযোগ দাবি করে,

প্রথমত, ‘ব্লক অ্যালোকেশন’ পদ্ধতিতে বড় অঙ্কের অর্থ রাখা হয়েছে অনুমোদিত প্রকল্প ছাড়াই এতে বাজেট শৃঙ্খলা ভঙ্গের ঝুঁকি রয়েছে।

দ্বিতীয়ত, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সংখ্যা ৯৫ থেকে কমিয়ে ৯০ করা হয়েছে, সংহতকরণ ইতিবাচক, কিন্তু আরও কমানো দরকার এবং কার্যকারিতা মূল্যায়ন নিয়মিত করা প্রয়োজন।

তৃতীয়ত, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য বরাদ্দের একটি বড় অংশ ‘ব্লক’ হিসেবে রাখা হয়েছে অনুমোদিত প্রকল্প ছাড়া, এটি দ্রুত বরাদ্দ বাড়ানোর প্রয়োজনে করা হলেও, সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি ছাড়া অর্থ কোথায় যাবে তা স্পষ্ট নয়।

সবশেষে, স্টিগলিৎজের প্রিয় প্রশ্ন দিয়ে শেষ করি, অর্থনীতি কার জন্য? এই বাজেটে ব্যাংক লুটেরাদের জন্য ৪০,০০০ কোটির পুনর্মূলধন আছে, আর গরিব মানুষের জন্য মাসে ২,৫০০ টাকা ফ্যামিলি কার্ড আছে। আনুপাতিক বিচারে এটি একটি নিষ্ঠুর বৈপরীত্য।

বাজেটের কাঠামো পরিবর্তন না হলে, বৈষম্যের মূলে কুঠারাঘাতের স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে। কিন্তু এই যাত্রার নিঃসন্দেহে আগের চেয়ে ভালো। তবে অতীত অভিজ্ঞতা সুখকর না হওয়ায় সংশয় কিন্তু রয়েই যাচ্ছে।

এম এম মুসা : উন্নয়নকর্মী ও গবেষক

বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।