ঢাকাবুধবার , ২৪শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
  1. অপরাধ
  2. অর্থনীতি
  3. অস্ট্রেলিয়া
  4. আইন আদালত
  5. আন্তর্জাতিক
  6. ইসলাম
  7. কৃষি
  8. খেলাধুলা
  9. জাতীয়
  10. তথ্যপ্রযুক্তি
  11. নেদারল্যান্ডস
  12. পর্যটন
  13. বিনোদন
  14. মতামত
  15. মেক্সিকো
আজকের সর্বশেষ সবখবর

ইরান যুদ্ধের ধাক্কায় টলছে নেতানিয়াহু

আজকের কলাপাড়া অনলাইন ডেস্ক
জুন ২২, ২০২৬ ১২:২২ অপরাহ্ণ
Link Copied!

গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধের যে প্রাথমিক সমঝোতা হয়েছে, তাতে সবচেয়ে বড় পরাজিত ব্যক্তি বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। ইতিহাস তাকে এমন একজন নেতা হিসেবে মনে রাখবে, যিনি মধ্যপ্রাচ্যকে যুদ্ধ ও ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিয়েছেন। তার কাছে প্রায় সব সমস্যার সমাধান ছিল একই। গাজায় হামাস, পশ্চিম তীরে অবৈধ ভূমি দখল, ইসরায়েলের আরব নাগরিকদের একটি অংশ, শান্তিকর্মীদের ত্রাণবাহী নৌবহর, লেবাননের হিজবুল্লাহ, সিরিয়া, ইরাক ও ইয়েমেনের বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী কিংবা ইরানের ইসলামী শাসনব্যবস্থা, সব ক্ষেত্রেই তার উত্তর ছিল কঠোর সামরিক শক্তি। এ শক্তি প্রয়োগ অনেক সময় আন্তর্জাতিক আইন উপেক্ষা করেছে। শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করেছে। ইরানের বিরুদ্ধে বিনা উসকানিতে শুরু হওয়া এ যুদ্ধ ছিল সেই নীতির সবচেয়ে বড় উদাহরণ। এটি ছিল অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগের চূড়ান্ত প্রকাশ। প্রত্যাশা অনুযায়ী এ পথও সফল হয়নি। ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন মরিয়া হয়ে প্রমাণ করার চেষ্টা করছেন যে, ভার্সাইয়ে স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি সমঝোতা কোনো আত্মসমর্পণ নয়। তিনি এটিকে একটি সাফল্য হিসেবে দেখাতে চাইছেন। ট্রাম্প হয়তো এ রাজনৈতিক অস্বস্তি থেকে বেরিয়ে আসতে পারবেন। কিন্তু নেতানিয়াহুর জন্য এর ফল অনেক বেশি গুরুতর হতে পারে। এ সংকট তার রাজনৈতিক জীবনের সমাপ্তি ডেকে আনতে পারে।

অনেকদিক থেকে ইসরায়েলের সবচেয়ে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করা প্রধানমন্ত্রী এখন অতীতের মানুষে পরিণত হয়েছেন। তার রাজনৈতিক জীবনের মূল্যায়ন অনেকটা অভিযোগপত্রের মতো শোনায়। দীর্ঘ সময় তিনি ফিলিস্তিনিদের জন্য দুটি রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের বিরোধিতা করেছেন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের ভয়াবহ হামলা ঠেকাতে তিনি ব্যর্থ হন। এরপর গাজায় ব্যাপক প্রতিশোধমূলক অভিযান চালান। ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য তিনি কট্টর ডানপন্থি রাজনীতিবিদদের সরকারে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেন। এতে ইসরায়েলের ভেতরে ও বাইরে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়। ২০১৫ সালের আন্তর্জাতিকভাবে সমর্থিত ইরান পারমাণবিক চুক্তিও তিনি দুর্বল করার চেষ্টা করেছিলেন। পরে ট্রাম্প সেই চুক্তি থেকে সরে যান। এর ফলেই এ বছরের ধ্বংসাত্মক সংঘাতের পথ তৈরি হয়। তবে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক পতনের সবচেয়ে বড় কারণ এসবের কোনোটি নয়। সবচেয়ে বড় কারণ হলো, তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিশেষ সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করেছেন। অনেকের মতে, এ সম্পর্ক এখন গুরুতরভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর সম্পর্কও এখন খুব খারাপ অবস্থায় রয়েছে। তারা প্রায় কথাই বলেন না। হোয়াইট হাউসের অনেকেই মনে করেন, নেতানিয়াহুর সহজ বিজয়ের প্রতিশ্রুতি যুক্তরাষ্ট্রকে এমন এক যুদ্ধে টেনে নিয়েছে, যা জেতা সম্ভব ছিল না। গাজা যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ জনগণের মধ্যেও ইসরায়েল সম্পর্কে অসন্তোষ বেড়েছে। এখন যখন শান্তির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, তখন অনেকের আশঙ্কা নেতানিয়াহু নিজেই সেই প্রক্রিয়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করছেন। কারণ তিনি লেবাননে সামরিক অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন। হারেৎজ পত্রিকার কলাম লেখক জশুয়া লাইফার লিখেছেন, ট্রাম্প হয়তো যে কোনো ফিলিস্তিনপন্থি কর্মীর চেয়েও বেশি ডেমোক্র্যাট সমর্থককে ইসরায়েল থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছেন। এরপর নেতানিয়াহুর বিভিন্ন পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। তিনি কট্টর জাতীয়তাবাদী রাজনীতিকে সমর্থন করেন। বসতি সম্প্রসারণ এবং ভূমি দখলকে উৎসাহ দেন। গাজা, লেবানন এবং পরে ইরানে তার যুদ্ধগুলোও প্রত্যাশিত ফল দেয়নি।

এসব কারণে পুরোনো ঐকমত্য আরও ভেঙে পড়ে। সাম্প্রতিক জরিপগুলো একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলিদের তুলনায় ফিলিস্তিনিদের প্রতি সহানুভূতি বেশি দেখা যাচ্ছে। অনেকেই এখন প্রশ্ন তুলছেন, এ জোট আদৌ যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষা করছে কি না। কেউ কেউ ইসরায়েলের জন্য সামরিক সহায়তা বন্ধ বা সীমিত করার পক্ষেও মত দিচ্ছেন। মজার বিষয় হলো, এ সমালোচনা শুধু বামপন্থিদের কাছ থেকে আসছে না। ট্রাম্পপন্থি ‘মাগা’ সমর্থকদের মধ্যেও একই ধরনের মত দেখা যাচ্ছে। ট্রাম্প যদি সত্যিই ব্যক্তিগতভাবে নেতানিয়াহুকে নিয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে থাকেন, তাহলে সেটি দুই দেশের পারস্পরিক আস্থার গভীর সংকটের প্রতিফলন। এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে। নেতানিয়াহু এমন একটি কাজ করেছেন, যা তার আগের কোনো ইসরায়েলি নেতা করতে পারেননি। তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি একটি বড় যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলেছেন। এখন তিনি আরেকটি নজিরবিহীন ঘটনার কেন্দ্রেও অবস্থান করছেন। সেটি হলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে গভীর কৌশলগত বিভাজন। ট্রাম্পের ইরান চুক্তি ইসরায়েলের অনেক মানুষকে হতবাক করেছে। শুধু ডানপন্থিরাই নয়, অন্য অনেকেও এতে বিস্মিত হয়েছেন। নেতানিয়াহু জনগণকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকি চিরতরে দূর করা হবে। তিনি আরও বলেছিলেন, হিজবুল্লাহসহ ইরানের আঞ্চলিক মিত্রদের দুর্বল করা হবে। এমনকি ইরানে শাসন পরিবর্তনের কথাও বলা হয়েছিল।

 

 

কিন্তু এসব লক্ষ্য পূরণ হয়নি। ইসরায়েলের দৃষ্টিকোণ থেকে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ডদের প্রভাবাধীন শাসনব্যবস্থা এখন আগের চেয়ে আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠছে বলে মনে হচ্ছে। গত সপ্তাহে জি-সেভেন সম্মেলনের পর ট্রাম্প নেতানিয়াহুর বহু গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন, ইরানকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অনুমতি দিতে হবে। ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রাখার অধিকারও তাদের রয়েছে। একই সঙ্গে ইরানের জব্দ করা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়ার কথাও বলেন। বৃহত্তর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের অংশ হিসেবেও তিনি এসব প্রস্তাব দেন। যুক্তরাষ্ট্র লেবাননে তাৎক্ষণিক ও স্থায়ী যুদ্ধবিরতির ইরানি দাবিকেও সমর্থন করে। যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স আরও কঠোর ভাষায় নেতানিয়াহুকে যুদ্ধ বন্ধ করার আহ্বান জানান। তিনি সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রই এখন ইসরায়েলের একমাত্র শক্তিশালী মিত্র।

প্রচলিত রাজনৈতিক মানদণ্ডে এ প্রকাশ্য বিরোধ ইসরায়েলের জন্য বড় ধরনের বিপর্যয়। নেতানিয়াহু এখন কঠিন অবস্থায় পড়েছে। তিনি যদি ট্রাম্পের অবস্থান অমান্য করেন, তাহলে ইরান আবার যুদ্ধ শুরু করতে পারে। এতে শান্তি চুক্তিও ভেঙে যেতে পারে। গত শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে পরবর্তী আলোচনা থেকে ইরান সরে যায়। কারণ ইসরায়েল হিজবুল্লাহর ওপর হামলা চালিয়েছিল। পরে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা জানান, উভয়পক্ষ আগের যুদ্ধবিরতি পুনর্বহালে সম্মত হয়েছে।

অন্যদিকে, নেতানিয়াহু যদি ট্রাম্পের সব নির্দেশ মেনে নেন, তাহলে তার রাজনৈতিক অবস্থান আরও দুর্বল হতে পারে। বিশেষ করে লেবানন থেকে পুরো সেনা প্রত্যাহারের প্রশ্নে আপস করলে তার কট্টর ডানপন্থি মিত্ররাও মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন। যে পথই তিনি বেছে নিন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিশেষ সম্পর্ক দ্রুত আগের অবস্থায় ফিরবে বলে মনে হয় না। এ বিভেদের সম্ভাব্য প্রভাব অনেক দূর পর্যন্ত যেতে পারে। এটি হয়তো ইসরায়েলি ব্যতিক্রমবাদের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সমাপ্তির সূচনা হয়ে থাকবে। এটি হয়তো বৃহত্তর ইসরায়েল গঠনের নেতানিয়াহুর স্বপ্নের অবসান ঘটাবে।

এটি এমন এক ময়েরও সূচনা হতে পারে, যখন যুক্তরাষ্ট্রের নিঃশর্ত সমর্থন ও সীমাহীন সামরিক সহায়তা আর আগের মতো থাকবে না। এর ফলে ট্রাম্পের আব্রাহাম চুক্তি সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও ব্যাহত হতে পারে। সৌদি আরব এবং উপসাগরীয় অন্যান্য দেশ এখন যুদ্ধ-পরবর্তী বাস্তবতায় নিজেদের অবস্থান নতুন করে নির্ধারণ করছে। গাজা নিয়ে ট্রাম্পের তথাকথিত শান্তি পরিকল্পনাও হয়তো শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হবে। একই সঙ্গে ইরানের দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা কমে আসতে পারে। তেহরান আবার বৈশ্বিক কূটনীতির মূল ধারায় ফিরে আসতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এতে ইসরায়েল আরও নিরাপদ হবে না। নিরাপত্তাহীনতাও বাড়তে পারে। নেতানিয়াহু তার পুরো রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ইরানের বিরুদ্ধে একটি ঐতিহাসিক বিজয়ের ওপর নির্ভর করিয়েছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন এ বিজয় তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে শক্তিশালী করবে। কিন্তু সেই লক্ষ্য পূরণ হয়নি। তিনি বড় ধরনের পরাজয়ের মুখে পড়েছেন। এখন তাকে সে সিদ্ধান্তগুলোর ফল ভোগ করতে হবে। আর কোনো সংকট সৃষ্টি করবেন না। নতুন কোনো অজুহাতও দেবেন না। পদচ্যুত হওয়ার অপেক্ষা করবেন না। পদত্যাগ করুন।

লেখক: দ্য গার্ডিয়ানের পররাষ্ট্রবিষয়ক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক। গার্ডিয়ানে প্রকাশিত নিবন্ধটি ভাষান্তর করেছেন তহমিনা মিলি

বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।