সোনারগাঁয়ে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার এক নারীর পরিবার এখন চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। ধর্ষণের ঘটনায় মামলা দায়েরের পর থেকেই আসামিপক্ষ ও তাদের সহযোগীদের কাছ থেকে প্রাণনাশের হুমকি পাচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীর স্বামী। এমনকি মুমূর্ষু স্ত্রীকে হাসপাতালে ভর্তি করার পরও সেখানে গিয়ে একদল লোক তাকে ভয়ভীতি প্রদর্শনের চেষ্টা করেছে বলে দাবি করেছেন তিনি।
সোমবার দুপুরে কান্নাজড়িত কণ্ঠে দৈনিক ভোরের আওয়াজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ভুক্তভোগী নারীর স্বামী বলেন, আমার স্ত্রী মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছে। অথচ আমরা হাসপাতালেও নিরাপদ নই। ৬-৭ জন লোক হাসপাতালে আসে। তাদের মধ্যে দুজন উপরে উঠে আমাকে আড়ালে ডেকে নিয়ে কথা বলতে চায়। আমি ভয়ে যাইনি। বলেছি, যা বলার এখানেই বলেন। পরে দেখি তারা নিচে নেমে আরও কয়েকজনের সঙ্গে একত্রে চলে যায়। বিষয়টি থানার ওসিকে জানিয়েছি। কিন্তু থানায় যেতে বলা হয়েছে। আমি কীভাবে থানায় যাব? যদি পথে তারা আমাদের ওপর হামলা করে?
ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, গত ১০ জুন সোনারগাঁ উপজেলার জামপুর ইউনিয়নের শিরাব এলাকায় স্থানীয় যুবদল নেতা মো. শহীদ ও তার সহযোগী শাহিন মিয়া ওই গৃহবধূকে ধর্ষণ করে। ঘটনার সময় তার স্বামী কর্মস্থলে ছিলেন। বিকেলে বাড়িতে একা থাকা অবস্থায় অভিযুক্তরা মুখ চেপে ধরে সন্তানদের ভয় দেখিয়ে তাকে পাশের একটি ভবনের নিচতলার কক্ষে নিয়ে যায় এবং হাত-মুখ বেঁধে ধর্ষণ করে।
পরে স্বামী বাড়িতে ফিরে এলে ভুক্তভোগী তাকে পুরো ঘটনা জানান। এরপর সোনারগাঁ থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হলে পুলিশ তদন্ত শুরু করে এবং ১২ জুন রাতে অভিযান চালিয়ে অভিযুক্ত যুবদল নেতা মো. শহীদ ও সহযোগী শাহিন মিয়াকে গ্রেফতার করে।
তবে মামলা দায়েরের পর থেকেই নতুন করে শুরু হয়েছে ভয়ভীতি ও চাপ প্রয়োগের অভিযোগ। ভুক্তভোগীর স্বামী হানিফ বলেন, মামলা করার সময়ই এক প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা আমাদের বাধা দিয়েছেন। এখন আসামিদের লোকজন মামলা তুলে নিতে বলছে। প্রতিনিয়ত হুমকি দিচ্ছে। মনে হচ্ছে তারা আমাদের মেরে ফেলবে। আমরা ভাড়া বাসায় ফিরতে পারছি না। কোথাও নিরাপদ নই।
তিনি আরও বলেন, আমার কাছে কোনো টাকা-পয়সা নেই। দুই সন্তানকে নিয়ে কয়েক দিন ধরে প্রায় অনাহারে আছি। স্ত্রী হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে। আমরা শুধু ন্যায়বিচার চাই। যারা আমার স্ত্রীর সম্ভ্রম লুটেছে, আমার পরিবারকে ধ্বংস করেছে, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।
পরিবারটির দাবি, স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য পুলিশ ভুক্তভোগী নারীকে নারায়ণগঞ্জ ভিক্টোরিয়া জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে এলেও পরে তাদের নিরাপত্তার কোনো কার্যকর ব্যবস্থা করা হয়নি। হাসপাতালের বাইরে খোলা আকাশের নিচে অসুস্থ স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে হয়েছে। পরে হাসপাতালের আরএমও জহিরুল ইসলাম ও চিকিৎসক গোলাম মোস্তফার উদ্যোগে ভুক্তভোগী নারীকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

এদিকে হাসপাতালেও সন্দেহভাজন লোকজনের আনাগোনা এবং ভুক্তভোগীর স্বামীকে আড়ালে ডেকে নেওয়ার চেষ্টা নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। প্রশ্ন উঠেছে, ধর্ষণ মামলার বাদী পরিবার যদি হাসপাতালেও নিরাপদ না থাকে, তাহলে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে কে?
এ বিষয়ে সোনারগাঁ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) গোলাম সারোয়ার বলেন, ঘটনার পরপরই পুলিশ অভিযান চালিয়ে দুই আসামিকে গ্রেফতার করেছে। মামলার তদন্ত চলছে। ভুক্তভোগী নারী ও তার পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ কাজ করছে। আসামিরা যতই প্রভাবশালী হোক, আইনের আওতায় এনে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে ভুক্তভোগী পরিবারের প্রশ্ন একটাই গ্রেফতার হয়েছে দুজন, কিন্তু হুমকি বন্ধ হয়নি কেন? হাসপাতাল পর্যন্ত যদি আতঙ্কের ছায়া পৌঁছে যায়, তাহলে বিচারপ্রার্থীরা কোথায় গিয়ে আশ্রয় নেবে?
স্থানীয়দের দাবি, ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধের বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি ভুক্তভোগী পরিবারকে অবিলম্বে পুলিশি নিরাপত্তা, আশ্রয় ও মানবিক সহায়তা দিতে হবে। অন্যথায় ভয়ভীতি ও প্রভাবশালীদের চাপে ন্যায়বিচারের পথ আরও কঠিন হয়ে উঠবে।
