ইউরোপ পাঠানোর নামে হবিগঞ্জে ‘মুনতাহা ট্রাভেলস’-এর কোটি টাকা আত্মসাৎ, নিঃস্ব বহু যুবক’ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে লোভনীয় বেতনে চাকরির ভুয়া প্রলোভন ও জাল ওয়ার্ক পারমিট দেখিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে হবিগঞ্জের একটি ট্রাভেল এজেন্সির বিরুদ্ধে । হবিগঞ্জ শহরের আর. কে. মিশন রোডে অবস্থিত ‘মুনতাহা ট্রাভেলস’ নামক এই এজেন্সির ¯স্বত্বাধিকারী মাহমুদ আল ফয়ছল ও ম্যানেজার ফরহাদ হোসেনের বিরুদ্ধে প্রতারণা, অর্থ আত্মসাৎ এবং জালিয়াতির সুনির্দিষ্ট প্রমাণ মিলেছে।
এই ঘটনায় ভুক্তভোগীরা জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার এবং স্থানীয় অস্থায়ী সেনা ক্যাম্পে একাধিক লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। ভুক্তভোগী ও নথিপত্র সূত্রে জানা যায়, মুনতাহা ট্রাভেলস আয়ারল্যান্ড, সার্বিয়াসহ ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ওয়ার্ক পারমিট ভিসায় পাঠানোর নাম করে সহজ-সরল মানুষদের ফাঁদে ফেলে, জনপ্রতি আট থেকে দশ লাখ টাকার চুক্তি করে তারা ধাপে ধাপে নগদ টাকা, ব্যাংক লেনদেন এবং ব্যাংক চেকের মাধ্যমে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়। বিশ্বাস অর্জনের জন্য ভুক্তভোগীদের হোয়াটসঅ্যাপে জাল ওয়ার্ক পারমিট ও ভুয়া কাগজপত্র পাঠানো হতো। আজমিরীগঞ্জ ও উল্লাপাড়ার বাসিন্দা ভুক্তভোগী আজাদ তালুকদার জানান, আয়ারল্যান্ড ও মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানোর কথা বলে ডাচ-বাংলা ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট ও নগদের মাধ্যমে তার কাছ থেকে ধাপে ধাপে মোট ৮ লাখ ২০ হাজার টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। ডাচ-বাংলা ব্যাংকের নথিতে একাধিকবার বিভিন্ন অংকের টাকা স্থানান্তরের স্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে।
আজাদ তালুকদার বলেন, “ফাইল মুভমেন্ট, ভিসা প্রসেসিং ও ম্যানপাওয়ার অনুমোদনের নামে তারা আমার সব টাকা নিয়ে এখন আমাকে নিঃস্ব করে দিয়েছে। পরবর্তীতে জাল ওয়ার্ক পারমিট ধরা পড়ার পর টাকা ফেরত চাইলে তাকে উল্টো প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। একইভাবে সার্বিয়া পাঠানোর কথা বলে বানিয়াচংয়ের মো. কারিমুল ইসলামের কাছ থেকে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা ও পাসপোর্ট কেড়ে নেয় এই চক্র। দীর্ঘদিন পার হলেও ভিসা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় কারিমুল টাকা ফেরত চাইলে টালবাহানা শুরু করে অভিযুক্তরা। শুধু আজাদ বা কারিমুলই নন, জেলা প্রশাসকের কাছে ১৭ জন ভুক্তভোগীর একটি সম্মিলিত অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়েছে । এই তালিকায় থাকা মুহাম্মদ আব্দুল লতিফ, মো. হৃদয় আহমেদ, মো. রুয়েল মিয়া, মো. তোফাজ্জল হোসেনসহ অনেকেই ২ থেকে সাড়ে ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত খুইয়েছেন ।
আত্মসাৎকৃত এই টাকার পরিমাণ সব মিলিয়ে প্রায় অর্ধকোটি টাকার ওপরে । অনুসন্ধানে জানা যায়, টাকা ফেরত চাইলে অভিযুক্তরা নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে অসংলগ্ন ‘ভিসা গ্যারান্টি চুক্তি’ এবং জামানত হিসেবে ফাঁকা চেক প্রদান করে প্রতারণার নতুন নাটক সাজায়। পরবর্তীতে আসামির পরিবারের সদস্যরা (মা, স্ত্রী, ভাই) নির্দিষ্ট তারিখে টাকা ফেরতের আশ্বাস দিলেও তারা কথা রাখেনি এবং বর্তমানে পুরো চক্রটি গা ঢাকা দিয়েছে। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, উত্থাপিত অভিযোগ এবং ব্যাংক ট্রান্সফার ও স্ট্যাম্প চুক্তির নথিপত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এটি বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৪২০ (প্রতারণা), ৪০৬, ৪৬৮ ও ৪৭১ (জালিয়াতি ও জাল দলিল ব্যবহার) ধারার আওতায় একটি স্পষ্ট ফৌজদারি অপরাধ।
ভুক্তভোগীরা জানান, থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত কোনো মামলা রেকর্ড হয়নি এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধেও দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। উল্টো তারা বর্তমানে চরম নিরাপত্তাহীনতা ও চরম আর্থিক-মানসিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়ে পথে বসার উপক্রম হয়েছেন। ভুক্তভোগী যুবসমাজ অবিলম্ভে মাহমুদ আল ফয়ছল, ফরহাদ হোসেন ও তাদের সহযোগীদের দ্রুত গ্রেপ্তার, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং আত্মসাৎকৃত টাকা ও পাসপোর্ট উদ্ধারের জন্য প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কঠোর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
