খুলনায় বিশাল অঙ্কের অর্থ আত্মসাতের একটি চাঞ্চল্যকর দুর্নীতি মামলায় সোনালী ব্যাংকের ছয়জন সাবেক কর্মকর্তা ও এক ব্যবসায়ীসহ মোট সাতজনকে দীর্ঘমেয়াদী কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। আদালত এই মামলায় অভিযুক্ত প্রত্যেক আসামিকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করেছেন। একই সঙ্গে তাদের প্রত্যেককে প্রায় ৯৩ কোটি টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছে, যা পরিশোধ করতে ব্যর্থ হলে তাদের আরও দুই বছর বিনাশ্রম কারাভোগ করতে হবে। খুলনা বিভাগীয় স্পেশাল জজ আদালতের বিচারক মুহা. আদীব আলী সম্প্রতি এই আলোচিত রায় ঘোষণা করেন। আদালতের উচ্চমান বেঞ্চ সহকারী মো. ইয়াসীন আলী সংবাদমাধ্যমকে রায়ের এই বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে বিচারিক কার্যক্রমের সময় দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের মধ্যে দু’জন আদালতে উপস্থিত ছিলেন না।
এই মামলার দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়ায় আদালত যে সাতজনকে দোষী সাব্যস্ত করেছেন, তাদের মধ্যে ব্যাংকের বিভিন্ন স্তরের সাবেক কর্মকর্তারা ছাড়াও এক ব্যবসায়ী রয়েছেন। দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন দৌলতপুর থানার ডিসি রোডের মেসার্স ইষ্টার্ণ ট্রেডসের স্বত্বাধিকারী ও মামলার অন্যতম পলাতক আসামি সনজিৎ কুমার দাস। এছাড়া সোনালী ব্যাংকের দৌলতপুর করপোরেট শাখার সাবেক গোডাউন কিপার মো. মতিয়ার রহমান, সহকারী জেনারেল ম্যানেজার মো. নজরুল ইসলাম এবং পলাতক সাবেক সহকারী মহাব্যবস্থাপক মানিক চন্দ্র মন্ডল এই রায়ের আওতায় এসেছেন। তালিকায় থাকা অন্য অভিযুক্তরা হলেন ব্যাংকের সাবেক সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার মো. রুহুল আমিন, সাবেক প্রিন্সিপাল অফিসার মো. সিরাজুল ইসলাম এবং সাবেক অফিসার অজিত কুমার সরকার। ব্যাংকিং খাতের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালনকালে ক্ষমতার অপব্যবহার করে রাষ্ট্রীয় অর্থ তছরুপের অভিযোগে তাদের এই শাস্তি দেওয়া হয়েছে।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পাবলিক প্রসিকিউটর আরজিনা সুলতানা সাথী এই মামলার আইনি দিক ও পটভূমি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যবসায়ী সনজিৎ কুমার দাস সোনালী ব্যাংকের খুলনা দৌলতপুর করপোরেট শাখা থেকে ঋণ হিসেবে বিপুল পরিমাণ অর্থ গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু নিয়মানুযায়ী পাট ক্রয়ের জন্য সেই অর্থ ব্যবহারের কথা থাকলেও তিনি তা না করে আত্মসাৎ করেন। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের এই অর্থ লুটের ঘটনায় ২০১৯ সালে দুর্নীতি দমন কমিশন বাদী হয়ে সংশ্লিষ্ট সাতজনের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করে। মামলার এজাহারে প্রায় ৯২ কোটি ৬৩ লাখ টাকা ব্যাংক থেকে জালিয়াতির মাধ্যমে আত্মসাৎ করার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়েছিল।
দীর্ঘ তদন্ত ও সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে আদালত এই জালিয়াতি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় আসামিদের বিরুদ্ধে এই কঠোর রায় দেন। বিচারক তার রায়ে আর্থিক অপরাধ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা দিয়েছেন, যা আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা ফেরাতে ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। রায় ঘোষণার সময় পলাতক থাকা আসামিদের গ্রেফতারে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। এই রায় কার্যকর হলে এবং জরিপকৃত অর্থ আদায় করা সম্ভব হলে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের বড় একটি ক্ষতি পুনরুদ্ধার করা যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
