ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলায় এক ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে চাঞ্চল্যকর জালিয়াতির ঘটনা সামনে এসেছে, যেখানে জুয়ার আসরে দেনা পরিশোধের জন্য নিজের জীবিত মাকে মৃত দেখিয়ে পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। উপজেলার শেরপুর ইউনিয়নের রাজাবাড়িয়া গ্রামে এই মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটেছে, যা স্থানীয় এলাকাবাসীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। অভিযুক্ত আব্দুল জলিল দীর্ঘদিন ধরে জুয়া খেলায় আসক্ত থাকায় এর আগেও পরিবারের অন্যান্য সম্পত্তি বিক্রি করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। জুয়ার নেশার খরচ জোগাতে শেষ পর্যন্ত তিনি তার মা রহিমাকে মৃত সাজিয়ে বসতভিটাসহ একুশ শতক জমি অন্যের কাছে হস্তান্তর করেন। পরিবারের অজান্তে গোপনে এই পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করা হয় এবং বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে সবার কাছ থেকে লুকিয়ে রাখা হয়।
কয়েক মাস আগে জমির ক্রেতা মজিবুর রহমান দলবল নিয়ে ওই সম্পত্তির বিভিন্ন অংশ নিজের দাবি করে দখলে নেওয়ার চেষ্টা করলে এই জালিয়াতির বিষয়টি সবার গোচরে আসে। এরপর ভুক্তভোগী পরিবার নান্দাইল সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে সংশ্লিষ্ট দলিলের সার্টিফাইড কপি সংগ্রহ করে হতবাক হয়ে যায়। নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, গত ১৮ ফেব্রুয়ারি ১১৫৪ ও ১১৫৫ নম্বর দুটি দলিলের মাধ্যমে মোট একুশ শতক জমি রেজিস্ট্রি করা হয়েছে। পার্শ্ববর্তী পূর্ব রাজাবাড়িয়া গ্রামের মৃত আমির হোসেনের ছেলে মজিবুর রহমান এই জমির ক্রেতা হিসেবে যুক্ত রয়েছেন, আর পুরো দলিলটি সম্পাদন করেছিলেন ঝন্টু সরকার নামের এক স্থানীয় দলিল লেখক। এই জালিয়াতির প্রক্রিয়ায় মো. হোসেন মিয়া নামের এক ব্যক্তি সাক্ষী হিসেবে স্বাক্ষর করেছেন বলেও নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
নিজেকে জীবিত প্রমাণ করতে গিয়ে ভুক্তভোগী বৃদ্ধা রহিমা বেগম কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং তার অজান্তে সম্পত্তি বিক্রির ঘটনায় কঠোর বিচার দাবি করেন। তিনি গণমাধ্যমের সামনে ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান যে, তিনি বেঁচে থাকা সত্ত্বেও তাকে কীভাবে মৃত বানিয়ে দিল তার কোনো সদুত্তর তিনি পাচ্ছেন না। অভিযুক্ত জলিলের স্ত্রী নাছিমা বেগমও তার স্বামীর এই অনৈতিক কাজের তীব্র সমালোচনা করে বলেন যে, জুয়ার নেশার কারণে পরিবারটি আজ সর্বস্বান্ত। জলিলের ছোট ভাই অলি মিয়ার ভাষ্যমতে, তার ভাই মূলত একটি জুয়াড়ি চক্রের খপ্পরে পড়ে সর্বস্ব হারিয়েছেন এবং সেই চক্রের দেনা মেটাতেই এই জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছেন।
এই জালিয়াতিতে ব্যবহৃত ভুয়া মৃত্যু সনদ ও ওয়ারিশান সনদ প্রদান নিয়ে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মো. হামিদুল তার ভুল স্বীকার করেছেন। তবে দলিল লেখক ঝন্টু সরকার দাবি করেছেন যে, তাকে ক্লায়েন্টপক্ষ থেকে যেসব কাগজপত্র দেওয়া হয়েছে, তিনি শুধু সেগুলো যাচাই করেই দলিল সম্পন্ন করেছেন এবং সঠিক তথ্য যাচাইয়ের দায়িত্ব তার একাই নয়। একজন জীবিত মানুষকে মৃত দেখিয়ে এ ধরনের সরকারি দলিল তৈরি হওয়ায় স্থানীয় সচেতন মহলে প্রশ্ন উঠেছে যে, ইউনিয়ন পরিষদ ও সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই ছাড়াই কীভাবে এত বড় অনিয়মকে বৈধতা দিল। ভুক্তভোগী পরিবার এবং স্থানীয় বাসিন্দারা এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তপূর্বক জড়িত সকলের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানিয়েছেন।
