মহান মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য বীরত্ব ও আত্মত্যাগের জন্য জাতির চিরস্মরণীয় ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখের ৫৫তম শাহাদতবার্ষিকী পালিত হয়েছে। ১৯৭১ সালের এই দিনে তিনি পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখ সমরে লড়তে গিয়ে নিজের জীবন উৎসর্গ করেন। তার এই আত্মত্যাগ ও দেশপ্রেম দেশবাসীর হৃদয়ে চিরকাল অনুপ্রেরণার প্রতীক হয়ে থাকবে। দিনটি উপলক্ষে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন এই বীরশ্রেষ্ঠকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিশেষ বার্তায় তার বীরত্বপূর্ণ জীবনের নানা দিক তুলে ধরা হয়।
১৯৩৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি নড়াইলের মহিষখোলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন নূর মোহাম্মদ শেখ। শৈশবে বাবা-মাকে হারানোর পর জীবনসংগ্রামের মধ্য দিয়ে বড় হওয়া এই বীর ২৩ বছর বয়সে পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলসে (ইপিআইআর) যোগদান করেন। কর্মজীবনের শুরু থেকেই তার প্রাণোচ্ছ্বল স্বভাব ও দায়িত্ববোধ সবার নজর কাড়ে এবং তিনি ১৯৬৫ সালের পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধেও অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে ১৯৭০ সালের আগস্ট মাসে তাকে যশোর সেক্টরে বদলি করা হয়। ২৫ মার্চের কালরাতে গণহত্যা শুরুর সময় তিনি ছুটিতে গ্রামে থাকলেও দেশের সংকটময় পরিস্থিতিতে ছুটি শেষ হওয়ার আগেই নিজের কর্মস্থলে ফিরে যান।
সেপ্টেম্বরের গোড়ার দিকে যশোরের চৌগাছা থানার ছুটিপুর এলাকার একটি প্রতিরক্ষা অবস্থানে গেরিলা যুদ্ধের অংশ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ। পাকিস্তানি বাহিনী কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই অঞ্চলটি দখল করার জন্য বারবার আক্রমণ চালাচ্ছিল। ঘটনার দিন সকালে তিনি চারজন সহযোদ্ধাকে নিয়ে একটি টহল দলের নেতৃত্ব দেওয়ার সময় শত্রুসেনারা তিন দিক থেকে তাদের ঘিরে ফেলে। শুরু হয় অতর্কিত ও তীব্র গোলাগুলি, যাতে নূর মোহাম্মদের এক সহযোদ্ধা মারাত্মকভাবে আহত হন। দলের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে তিনি মুহূর্তের মধ্যে আহত সহযোদ্ধার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন এবং পাল্টা আক্রমণ শুরু করেন।
পরিস্থিতি যখন অত্যন্ত জটিল হয়ে ওঠে, তখন আহত সহযোদ্ধা ও অস্ত্র সুরক্ষিত রাখতে সহযোদ্ধা সিপাহি মোস্তফাকে দলসহ নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার কঠোর নির্দেশ দেন তিনি। দলের সবাই নিরাপদে চলে যাওয়ার পর মারাত্মক আহত ও রক্তক্ষরণে দুর্বল নূর মোহাম্মদ একা হাতেই শত্রুদের মোকাবিলা করতে থাকেন। পাকিস্তানি বাহিনী তাকে একা পেয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করে এবং পরবর্তীতে মুক্তিযোদ্ধারা এসে তার ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করেন। বীর এই শহীদের মরদেহ শার্শা থানার কাশিপুর গ্রামে সমাহিত করা হয় এবং তার সর্বোচ্চ ত্যাগের স্বীকৃতি স্বরূপ রাষ্ট্র তাকে ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ খেতাবে ভূষিত করে।
