দেশের জ্বালানি খাতের দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং শিল্পকারখানার নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন বজায় রাখতে গভীর সমুদ্রে নতুন তরল প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের বিশাল পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। সম্প্রতি জাতীয় সংসদ অধিবেশনে এ সংক্রান্ত বিস্তারিত রূপরেখা তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী। দেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা মেটাতে ২০৩০ থেকে ২০৩১ সালের মধ্যে দেশজুড়ে অন্তত ১৫০টি নতুন কূপ খননের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সামুদ্রিক অঞ্চলের ২৬টি ব্লকে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানের উদ্দেশ্যে আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর অংশগ্রহণে একটি দরপত্র প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে, যার সময়সীমা আগামী বছর পর্যন্ত নির্ধারিত করা হয়েছে। এছাড়া স্থলভাগে জ্বালানি অনুসন্ধানে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য আধুনিক নীতিমালা প্রণয়নের কাজও এগিয়ে চলেছে। বিগত সময়ে এলএনজি সরবরাহ সাময়িকভাবে ব্যাহত হওয়ার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সরকার এই বহুমুখী ও সময়োপযোগী পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করেছে। ভবিষ্যতে যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত জ্বালানি সংকট এড়াতে এবং গ্যাসের বিকল্প উৎস নিশ্চিত করতে এই পরিকল্পনাগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
গ্যাসের বর্তমান অবকাঠামো আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে মহেশখালীর কুতুবজোমে একটি নতুন ভাসমান টার্মিনাল এবং মাতারবাড়িতে একটি স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের কাজ বর্তমানে বিভিন্ন পর্যায়ে বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা অনুযায়ী, কুতুবজোমের ভাসমান টার্মিনালটি চালু হলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অতিরিক্ত রি-গ্যাসিফাইড এলএনজি সরবরাহ করা সম্ভব হবে। এছাড়া দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় এলাকায় গভীর সমুদ্রের সুবিধাজনক স্থানে আরেকটি জরুরি ভাসমান টার্মিনাল স্থাপনের সম্ভাব্যতা নিয়ে নিবিড়ভাবে যাচাই-বাছাই চলছে। দেশের অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে ইতোমধ্যে দেশজুড়ে বিভিন্ন ব্লকে দ্বি-মাত্রিক ও ত্রি-মাত্রিক সাইসমিক সার্ভে পরিচালনার কাজ সাফল্যের সঙ্গে এগিয়ে চলছে। ভোটারের নিজস্ব গ্যাস জাতীয় পাইপলাইনের মাধ্যমে মূল ভূখণ্ডে এনে পরিকল্পিত শিল্পাঞ্চল, অর্থনৈতিক অঞ্চল ও রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সরবরাহের সুনির্দিষ্ট উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এসব অবকাঠামোগত উন্নয়ন সম্পন্ন হলে জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের সরবরাহ কেবল স্থিতিশীলই হবে না, বরং আকস্মিক কোনো ঘাটতি তৈরি হলেও শিল্পখাত বড় ধরনের বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা পাবে।
জ্বালানি খাতের আমদানিনির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনতে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতকে সরকার সর্বাধিক গুরুত্ব প্রদান করছে। এই রূপান্তরের অংশ হিসেবে জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র প্রণয়ন করা হয়েছে, যার মূল লক্ষ্য হলো নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি বড় অংশ বিকল্প উৎস থেকে নিশ্চিত করা। এই মহাপরিকল্পনার আওতায় দেশের বিভিন্ন জনপদের বাসাবাড়ি, সরকারি স্থাপনাসহ বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ছাদে ছাদভিত্তিক সোলার প্যানেল স্থাপনের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, বড় পরিসরে ভূমিভিত্তিক সৌরপ্রকল্প, বায়ু বিদ্যুৎ, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং আধুনিক কৃষিভিত্তিক সোলার প্রযুক্তির মতো বহুমুখী উদ্যোগ বাস্তবায়িত হচ্ছে। এই নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পগুলোর মাধ্যমে গ্রিডে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ যুক্ত হবে, যা দেশের সার্বিক বিদ্যুৎ নিরাপত্তাকে আরও সুদৃঢ় করবে। ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদার চাপ সামাল দিতে প্রথাগত জ্বালানির পাশাপাশি এই সবুজ জ্বালানির বিস্তার এখন সময়ের দাবি বলে সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে দেশি ও বিদেশি বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণের উদ্দেশ্যে সরকার শুল্ক কাঠামো এবং আমদানিনীতিতে নানামুখী যুগান্তকারী ছাড় দিয়েছে। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের মূল উপকরণ যেমন সোলার প্যানেল, ইনভার্টার এবং বিশেষায়িত ব্যাটারি আমদানির ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের কাস্টমস ও রেগুলেটরি শুল্ক সম্পূর্ণ অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এমনকি উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে বিক্রির ক্ষেত্রে সাধারণ ও বাণিজ্যিক গ্রাহকদের জন্য লাভজনক আর্থিক প্রণোদনা ঘোষণা করা হয়েছে, যা নেট মিটারিং ব্যবস্থার মাধ্যমে বাস্তবায়িত হচ্ছে। সরকারি ও বেসরকারি খাতের যৌথ অংশীদারিত্ব দৃঢ় করতে ইতোমধ্যে পিপিপি নির্দেশিকা, বিশেষ বিনিয়োগ নীতিমালা এবং আধুনিক উইন্ড গাইডলাইনের মতো বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ আইন ও নীতিমালা কার্যকর করা হয়েছে। এসব বহুমুখী ও সুদূরপ্রসারী উদ্যোগের ফলে দেশের জ্বালানি খাত ধীরে ধীরে একটি স্বাবলম্বী, টেকসই ও আধুনিক কাঠামোর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ফলশ্রুতিতে আগামী দিনে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রাখতে জ্বালানির পর্যাপ্ততা ও নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা অনেকটাই সহজ হবে।
