বিশ্বের প্রতিটি কোণে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়া এবং নিরক্ষরতার অন্ধকার দূর করার অঙ্গীকার নিয়ে প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস পালিত হয়ে থাকে। রাষ্ট্র ও সমাজের সার্বিক অগ্রগতি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে শিক্ষার প্রাথমিক ভিত্তি হিসেবে অক্ষরজ্ঞানের গুরুত্ব অপরিসীম। মূলত পৃথিবীকে ইতিবাচকভাবে বদলে দেওয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো শিক্ষা, যার সূচনা ঘটে সাক্ষরতার হাত ধরে। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষার সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট জনসংখ্যা ১৭ কোটি ছাড়িয়ে গেলেও সাক্ষরতার ক্ষেত্রে এখনো বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। সার্বিক সাক্ষরতার হার ৭৭ শতাংশের বেশি হলেও দেশের একটি বিশাল অংশ এখনো শিক্ষার আলোর বাইরে রয়ে গেছে।
সরকারি পরিসংখ্যান বিশ্লেשণ করলে দেখা যায় যে, দেশের ষাট বছর ও তদূর্ধ্ব বয়সী জনগোষ্ঠীর প্রায় ২২ শতাংশ মানুষ এখনো সাক্ষরতার আওতায় আসেনি। এর ফলে বর্তমান সময়েও দেশে প্রায় পৌনে চার কোটি মানুষ নিরক্ষর হিসেবে রয়েছে, যা দেশের সার্বিক উন্নয়নের গতিকে মন্থর করে দিচ্ছে। সরকারি সংজ্ঞামতে সাক্ষরতা কেবল নিজের নাম স্বাক্ষর করা বা সাধারণ অক্ষরজ্ঞান অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মাতৃভাষায় সাবলীলভাবে পড়া ও তা অনুধাবন করা, লিখিত বা মৌখিক উপায়ে বিভিন্ন বিষয় ব্যাখ্যা করা এবং গণনা করার সক্ষমতা অর্জনকেই প্রকৃত সাক্ষরতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে ইউনেস্কোর ঘোষণার পর থেকে বিশ্বব্যাপী এই দিবসটি পালিত হয়ে আসছে এবং এটি প্রতিটি মানুষের মৌলিক অধিকারের বিষয়টি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়।
সময়ের পরিবর্তনে এবং প্রযুক্তির আধুনিকায়নের সঙ্গে সঙ্গে সাক্ষরতার ধারণায় এসেছে আমূল পরিবর্তন। বর্তমানে কেবল বর্ণমালা চেনার পাশাপাশি প্রযুক্তিগত জ্ঞান অর্জন, সঠিক তথ্য যাচাইয়ের ক্ষমতা এবং জীবনমুখী দক্ষতা লাভ করাকে সাক্ষরতার প্রধান অঙ্গ হিসেবে গণ্য করা হয়। শিক্ষাবিদদের মতে, আগামী দশকের মধ্যে দেশকে সম্পূর্ণরূপে নিরক্ষরমুক্ত করার যে সরকারি লক্ষ্য রয়েছে, তার সামনে এই পৌনে চার কোটি নিরক্ষর মানুষ একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডভিত্তিক সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করে নিরক্ষর জনগোষ্ঠীর একটি হালনাগাদ তথ্যভাণ্ডার তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
একটি সমৃদ্ধ, উন্নত ও বৈষম্যহীন সমাজ গঠনে শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই কারণ সাক্ষরতা দারিদ্র্য বিমোচন, স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি এবং নারী ক্ষমতায়নে অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা জানিয়েছেন যে, সাক্ষরতার হার বৃদ্ধিতে দেশ বিগত বছরগুলোতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করলেও বঞ্চিত জনগোষ্ঠীকে শিক্ষার সুযোগের আওতায় আনতে সরকার কাজ করে যাচ্ছে। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমেদ উল্লেখ করেছেন যে, এই বিশাল সংখ্যক নিরক্ষর জনগোষ্ঠীকে শিক্ষার আলোয় আনতে হলে এলাকাভিত্তিক ব্যাপক ও কার্যকর কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা আবশ্যক। পরিশেষে, রাষ্ট্র ও সমাজ উভয়ের যৌথ প্রচেষ্টায় দেশের প্রতিটি নাগরিককে কার্যকর সাক্ষরতার আওতায় এনে একটি আলোকিত ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
