বৈঠার ছন্দে পানির বুক চিরে একের পর এক নৌকা ছুটে চলার দৃশ্য এবং মাঝিদের সম্মিলিত হুংকারে মুখরিত হয়ে ওঠে সুরমা নদীর তীর। সম্প্রতি কিশোরগঞ্জ জেলার ইটনা উপজেলার ধনপুর বাজারসংলগ্ন সুরমা নদীতে প্রথমবারের মতো জমজমাট এক নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। এই ঐতিহ্যবাহী আয়োজনকে কেন্দ্র করে নদীর দুই পাড়ে মানুষের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা যায় এবং পুরো হাওরাঞ্চল এক উৎসবমুখর জনসমুদ্রে পরিণত হয়। ঢাক-ঢোলের বাদ্য, হাততালি আর দর্শকদের উল্লাসে গ্রামীণ পরিবেশ এক অন্যরকম আনন্দের মাত্রায় পৌঁছে যায়। কিশোরগঞ্জ ছাড়াও আশপাশের হবিগঞ্জ ও নেত্রকোনা জেলা থেকে হাজার হাজার উৎসাহী মানুষ এই প্রতিযোগিতা উপভোগ করতে নদীর তীরে ভিড় জমান।
প্রতিযোগিতা শুরু হওয়ার পর থেকেই অংশগ্রহণকারী দলগুলোর মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু হয় এবং তা দর্শকদের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে এক দারুণ উত্তেজনা। জয় ছিনিয়ে আনতে মাঝিরা তাদের সর্বশক্তি দিয়ে বৈঠা টানতে থাকেন এবং তাদের তালে তালে নদীর পাড়ে উপস্থিত জনতা আরও বেশি উৎফুল্ল হয়ে ওঠে। অনেকে করতালির মাধ্যমে নিজেদের পছন্দের দলকে উৎসাহ জুগিয়েছেন, আবার অনেকেই এই রোমাঞ্চকর মুহূর্তগুলো নিজেদের মুঠোফোনে বন্দি করে রাখেন। শুধু নদীর তীরেই নয়, ব্যক্তিগত নৌকা কিংবা ভাড়া করা জলযানে চড়ে পরিবার ও বন্ধুদের নিয়ে নদীপথেও বহু মানুষকে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়। এর ফলে পুরো জলপথ ও নদীর পার এক বিশাল মিলনমেলায় রূপ নেয়, যা স্থানীয় বাসিন্দাদের দীর্ঘদিন মনে রাখার মতো একটি অভিজ্ঞতা উপহার দিয়েছে।
আয়োজকদের মতে, নৌকা বাইচ কেবল সাধারণ কোনো বিনোদন নয়, বরং এটি বাংলার হাজার বছরের পুরনো লোকসংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। বর্তমানের আধুনিকতার প্রভাবে যখন জারি, সারি, ভাটিয়ালি গান কিংবা লাঠিখেলা ও কাবাডির মতো ঐতিহ্যগুলো হারিয়ে যেতে বসেছে, তখন নতুন প্রজন্মের কাছে এসব পরিচয় করিয়ে দিতেই এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি যুবসমাজকে মাদকের করাল গ্রাস এবং নানাবিধ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রেখে খেলাধুলামুখী করে তোলার ক্ষেত্রেও এই ধরনের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। প্রথমবারেই এমন অভূতপূর্ব সাড়া পাওয়ায় স্থানীয় মানুষ এবং আয়োজকরা অত্যন্ত আনন্দিত ও উৎফুল্ল হয়েছেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ও বিশেষ অতিথিদের বক্তব্যেও গ্রামীণ ঐতিহ্য সংরক্ষণের এই প্রয়াস দারুণভাবে প্রশংসিত হয়। কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য ফজলুর রহমানসহ স্থানীয় প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ এই আয়োজনে উপস্থিত থেকে প্রতিযোগিতা উপভোগ করেন এবং বিজয়ী দলের হাতে পুরস্কার তুলে দেন। প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী মোট বারোটি নৌকার মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে আসা শাপলা বয়েজ ক্লাব প্রথম স্থান অধিকার করে এবং তাদের হাতে প্রধান আকর্ষণ ‘সোনার হরিণ’ পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়। এছাড়া দ্বিতীয় স্থান অর্জনকারী দল ‘রূপার ময়ূর’ এবং তৃতীয় স্থানাধিকারী দল একটি আকর্ষণীয় এলইডি টিভি পুরস্কার লাভ করে। স্থানীয়দের জোরালো প্রত্যাশা, প্রতিবছর নিয়মিতভাবে এই নৌকা বাইচের আয়োজন করা হলে হাওরের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি নতুন প্রজন্মের মাঝে আরও বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠবে।
