সন্তান, অর্থ বা শ্বশুরবাড়ির বিষয় নিয়ে প্রায় সব দম্পতির মধ্যেই মতবিরোধ দেখা দেয়। তবে গবেষকদের মতে, সুখী দম্পতিদের অন্যদের থেকে আলাদা করে তাদের ঝগড়ার বিষয় নয়, বরং সমস্যার সমাধানে নেওয়া দৃষ্টিভঙ্গি।
সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, সুখী দম্পতিরা সাধারণত দ্বন্দ্ব বা মতবিরোধের ক্ষেত্রে সমাধানমুখী মনোভাব গ্রহণ করেন। তারা এমন বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে বেশি আগ্রহী হন, যেগুলোর বাস্তবসম্মত সমাধান সম্ভব।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব টেনেসির সহযোগী অধ্যাপক এবং গবেষণার প্রধান লেখক অ্যামি রাউয়ার বলেন, সুখী দম্পতিরা সংঘাতের ক্ষেত্রে সমাধান খোঁজার চেষ্টা করেন। তারা সচেতনভাবেই এমন বিষয় বেছে নেন, যেগুলো নিয়ে কার্যকরভাবে কাজ করা যায়।
গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে ফ্যামিলি প্রসেস জার্নালে।
এতে মূলত নিজেদের সুখী দাম্পত্য জীবনের অধিকারী বলে মনে করেন এমন দুই দলের বিপরীত লিঙ্গের বিবাহিত দম্পতিদের পর্যবেক্ষণ করা হয়।
প্রথম দলে ছিলেন ৫৭টি দম্পতি, যাদের বয়স ছিল ৩০-এর মাঝামাঝি থেকে শেষের দিকে। তারা গড়ে প্রায় ৯ বছর ধরে বিবাহিত ছিলেন।
দ্বিতীয় দলে ছিলেন ৬৪টি দম্পতি, যাদের বয়স ছিল ৭০ বছরের শুরুর দিকে। তারা গড়ে ৪২ বছর ধরে বিবাহিত জীবন কাটিয়েছেন।
গবেষকরা অংশগ্রহণকারীদের তাদের সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুতর এবং সবচেয়ে কম গুরুতর সমস্যাগুলোর তালিকা করতে বলেন।
কোন বিষয়গুলোকে সবচেয়ে গুরুতর মনে করেছেন
বয়স্ক দম্পতিদের ক্ষেত্রে ঘনিষ্ঠতা, অবসর সময় কাটানো, গৃহস্থালির কাজের বণ্টন, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ এবং অর্থনৈতিক বিষয়গুলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হিসেবে উঠে আসে।
অন্যদিকে উভয় দলের দম্পতিরাই ঈর্ষা, ধর্ম এবং পারিবারিক কিছু বিষয়কে তুলনামূলকভাবে কম গুরুতর সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
সুখী দম্পতিরা কী নিয়ে ঝগড়া করেন
গবেষকরা যখন দম্পতিদের পারিবারিক সমস্যাগুলো নিয়ে আলোচনা করতে দেখেন, তখন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আসে।
অধিকাংশ দম্পতিই এমন বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন, যেগুলোর স্পষ্ট সমাধান রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে গৃহস্থালির কাজ কীভাবে ভাগ করা হবে বা অবসর সময় কীভাবে কাটানো হবে, এসব বিষয় বেশি উঠে এসেছে।
অন্যদিকে এমন বিষয়, যেগুলোর সমাধান কঠিন বা দীর্ঘমেয়াদি, সেগুলো নিয়ে তারা তুলনামূলকভাবে কম বিতর্ক করেছেন।
গবেষকদের মতে, এই সচেতন সিদ্ধান্তই সুখী ও দীর্ঘস্থায়ী দাম্পত্য সম্পর্কের অন্যতম রহস্য হতে পারে।
কেন এই কৌশল কার্যকর
অ্যামি রাউয়ারের মতে, বারবার এমন সমস্যার ওপর মনোযোগ দেওয়া, যেগুলোর সহজ সমাধান নেই, সম্পর্কের প্রতি আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দিতে পারে।
বরং সহজে সমাধানযোগ্য বিষয়গুলো আগে মিটিয়ে ফেলতে পারলে দুজনের মধ্যেই এক ধরনের নিরাপত্তাবোধ তৈরি হয়।
তিনি বলেন, যখন দম্পতিরা অনুভব করেন যে তারা একসঙ্গে কাজ করে সমস্যার সমাধান করতে পারেন, তখন তারা আরও জটিল বিষয়গুলো মোকাবিলার জন্যও আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠেন।
দীর্ঘদিনের দাম্পত্য জীবনে ঝগড়া কমে যায়
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, যারা দীর্ঘ সময় ধরে বিবাহিত জীবন কাটিয়েছেন, তারা তুলনামূলকভাবে কম গুরুতর সমস্যার কথা উল্লেখ করেছেন এবং সামগ্রিকভাবে তাদের মধ্যে ঝগড়াও কম হয়েছে।
গবেষকদের মতে, কোন সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান প্রয়োজন আর কোন বিষয় কিছু সময়ের জন্য পাশে রাখা যায়, সেই পার্থক্য বুঝতে পারার ক্ষমতাই দীর্ঘস্থায়ী ও সুখী সম্পর্কের অন্যতম ভিত্তি।
সম্পর্ক ভালো রাখতে কী শেখায় এই গবেষণা
গবেষণার ফলাফল ইঙ্গিত দেয়, সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে সব সমস্যার সমাধান একদিনে করার প্রয়োজন নেই। বরং এমন বিষয়গুলো দিয়ে শুরু করা ভালো, যেগুলো নিয়ে দুজন মিলে বাস্তবসম্মত সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব।
ছোট ছোট সমস্যার সফল সমাধান পারস্পরিক বিশ্বাস বাড়ায়, যোগাযোগ উন্নত করে এবং ভবিষ্যতের বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার শক্তি তৈরি করে।
অর্থাৎ সুখী দম্পতিরা ঝগড়া এড়িয়ে যান না। তারা শুধু জানেন কোন লড়াইটি আগে লড়া উচিত, আর কোন বিষয়টি পরে সমাধানের জন্য রেখে দেওয়া যায়।
সূত্র:গাল্ফ নিউজ
